Monday, January 31, 2011

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল !

ওয়াশিংটন থেকে এএফপি : মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে সরকার বিরোধী তীব্র বিক্ষোভ চলছে। চলমান ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও চলছে নানা আঙ্গিকের বিচার বিশে-ষণ। বিশেষত বিশ্বের একক ক্ষমতাধর আমেরিকার অবস্থান নির্ণয়ে তৎপর বিশে-ষকরা। তারা বলছেন, মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের চলমান বিক্ষোভ বৃহদাংশে মার্কিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যা পুরোদস্তুর এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের দুর্বল অবস্থানকেই তুলে ধরছে। কিছু পর্যবেক্ষক বলছেন, ১৯৯০'র দশকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইরাকের কাছ থেকে কুয়েত মুক্ত করায় এবং একযুগ স্থায়ী আরব ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়ার উদ্যোক্তা হিসেবে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল বর্তমানে এর নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একনায়কতান্ত্রিক তিউনিসিয়া, মিশর, ইয়েমেন ও জর্ডানে শুরু হয়েছে গণবিক্ষোভ। সরকার পরিবর্তনের দাবীতে ফুঁসে উঠেছে এসব দেশের জনগণ। কিন্তু লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার বিক্ষোভে উত্তাল সবগুলো দেশই বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র হিসেবে পরিচিত।
এদিকে সম্প্রতি ইরান ও সিরিয়া সমর্থিত হিজবুল্লাহর কারণে লেবাননে পশ্চিমা পন্থী সরকার ভেঙে গেছে। এছাড়া আরব-ইসরাইলী দ্বদ্বে ওয়াশিংটন দশকের পর দশক ধরে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে আসলেও গত বছর শান্তি আলোচনা ভেঙে গেলে বর্তমানে ফিলিস্তিনীরা জাতিসংঘের দিক থেকে মুখ ঘুরাতে শুরু করেছে। এ প্রেক্ষাপটে তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো শূন্যস্থান পূরণে আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বিশ্লেষক শিবলী তেলহামি এ কথা বলেন। ইউনিভাসি©র্ট অব ম্যারিল্যান্ডের রাষ্ট্র বিজ্ঞানী তেলহামি আরো বলেন, ‘গত এক দশকে এ অঞ্চলে যে মার্কিন প্রভাব কমেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।' তেলহামি বলেন, কুয়েতকে ইরাকী দখলমুক্ত করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী এ অঞ্চলে যে প্রভাব বলয় তৈরি করেছে তাকে কাজে লাগিয়েই যুক্তরাষ্ট্র আরব-ইসরাইল শান্তি আলোচনা শুরু করে। কিন্তু তিনি বলেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা এ সমীকরণ পাল্টে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহতার পর আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা চালায় এবং এতে হাজার হাজার লোকের প্রাণহানিসহ কয়েক হাজার কোটি ডলার ব্যয় হয়। এছাড়া তীব্র হয় আমেরিকা বিরোধী মনোভাব। আর আমেরিকা বিরোধী মনোভাবকে উস্কে দিতে শুরু করে ইরান। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার অভিযোগ করেছে, ইরাক ও আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ করছে ইরান। এছাড়া তেহরান লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনের জঙ্গী গ্রুপ হামাস ও ইসলামী জিহাদ গ্রুপকে অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য দিচ্ছে। কারনেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর বিশ্লেষক মারিনা ওত্তোওয়ে বলেন, ‘ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও ইরানের প্রভাব বেশি।'
এদিকে ওত্তোওয়ে অভিযোগ করেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ লেবানন থেকে সিরিয়াকে জোরপূর্বক বিতাড়নের চেষ্টার মধ্যদিয়ে পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তোলেন।
তিনি বলেন, লেবানন থেকে সিরীয় সৈন্যরা জোরপূর্বক সরে গেলেও দামেস্ক পূর্বাস্থায় ফিরে আসায় পরিস্থিতি হয়ে পড়েছে আরো অস্থিতিশীল।
লেবাননে পশ্চিমাপন্থী জোট সরকার গত ১২ জানুয়ারি ভেঙে গেছে। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরির হত্যাকান্ড নিয়ে জাতিসংঘ তদন্তের প্রেক্ষিতে কেবিনেট থেকে হিজবুল্লাহ ও তার মিত্রদের পদত্যাগের কারণে জোট সরকার ভেঙে যায়। এ সময় থেকেই সিরিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নাজিব মিকাতিকে সমর্থন দিতে শুরু করে। কিন্তু বলা হচ্ছে নাজিব মিকাতি হিজবুল্লাহ নেতৃত্বাধীন গ্রুপের লোক।
এদিকে মার্কিন সমর্থিত ফিলিস্তিনী নেতা মাহমুদ আববাস যুক্তরাষ্ট্রকে এড়িয়ে সরাসরি জাতিসংঘ ও ইউরোপের দিকে মুখ ঘুরাতে শুরু করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক শান্তি আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, সাপ্রতিক পরিবর্তনের প্রেততে তিউনিশিয়া ও মিশরে যুক্তরাষ্ট্রের সঠিক ও কার্যকর ভূমিকা ঠিক কি তা নির্ধারণে আমরা প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
কারণ আরব-ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়ায় মিশরই মূলভিত্তি।
উড্রো উইলসন সেন্টারের বিশে-ষক মিলার আরো বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সাপ্রতিক ঘটনা এ অঞ্চলে মার্কিন দূর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এ অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্র আর মূল চালিকাশক্তি নয়।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ তুলে ধরে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কখনই এমন কোন আঞ্চলিক শক্তিমত্তা ছিলনা যা দিয়ে সে ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো। বরং তার যা রয়েছে তাতে তার হামবড়া ভাবই ফুটে ওঠে।

No comments:

Post a Comment